কিছুদিন
আগের কথা। বাগেরহাটের শরনখোলা থানার এক ইউ,পি সদস্যের কথা বলি। তাঁর
কাছে কম্পিউটার ছিল বিশাল বিশ্ময়কর এক বস্তু। এত কাজ কীভাবে করে এই
যন্ত্র। গান শোনায়, ছবি দেখায়, কম্পোজ করতে দেয় আবার কথাও বলে। ইউপি
সদস্যের মতো অনেক গ্রামের মানুষ কম্পিউটারের কথা শুনে বিস্ময়ে হা হয়ে
থাকতো।
কিন্তু বাবরীঝাড়ের
মানুষগুলোর অবস্থা সেরকম নয়। মঙ্গাপীড়িত উত্তরবঙ্গের নীলফামারি জেলার
এই গ্রামটিতে কম্পিউটার এখন কোন বিস্ময় নয়। বরং চাষাবাদ, জমিজমা, রোগ-
বালাই থেকে শুরম্ন করে অধিকার বঞ্চিত মানুষেরাও দ্বারস্থ হয়
কম্পিউটারের। না, একটু ভুল বললাম। কম্পিউটারের নয় টেলিসেন্টারের।
গ্রাম পর্যায়ে কম্পিউটার তথা
তথ্য প্রযুক্তি’র প্রভাব দেখতে যাওয়া হয় নীলফামারির বাবরীঝাড় গ্রামে।
অল্প বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত এই গ্রামের মানুষরা এখন সবধরনের তথ্য সুবিধা
পাচ্ছে। আর তাদের কাছে তথ্যকে সহজলভ্য করেছে ‘ডেভেলপমেন্ট রিসার্চ
নেটওয়ার্ক (ডি.নেট)’। একটি টেলিসেন্টার এবং একটি কম্পিউটার স্বাৰরতা
কেন্দ্র রয়েছে বাবরীঝাড় গ্রামে। যা বদলে দিচ্ছে সমস্ত গ্রাম ও
আশেপাশের এলাকার দৃশ্যপট।
সমস্যা!
টিনসেড একতলা একটি বাড়ীর
সামনে সাইনবোর্ডে লাল কালিতে লেখা “সমস্যা?” পরামর্শের জন্য আসুন।
বাবরীঝড়ার টেলিসেন্টার তথা পলস্নী তথ্য কেন্দ্রে বিভিন্ন ধরনের সমস্যা
সমাধানের জন্য তথ্য দেয়া হয়। কৃষি, শিৰা, স্বাস্থ্য, আইন, অ-কৃষি
উদ্যোগ, লাগসই প্রযুক্তি, পলস্নীকর্মসংস্থান দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা,
সচেতনতা ইত্যাদি বিষয়ে গ্রামের মানুষরা তথ্য সহায়তা পায় এখান থেকে।
উক্ত সেন্টারের তথ্য কর্মী আরজু জানান, এই সেন্টারে তিনটি
কম্পিউটারের মাধ্যমে তথ্য সেবা দেয়া হয়। এরমধ্যে দুইটি কম্পিউটারে
ইন্টারনেট সংযোগ আছে। প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ৩০ জন আমাদের এই তথ্য
কেন্দ্রে আসে।
জীবনের জন্য তথ্য
বাবরীঝাড় গ্রামের মেয়ে
কুলসুম। কম বয়সে তার বিয়ে হয় এবং কয়েক বছরের মধ্যেই দুই সন্তানের
জন্ম দেয়। কিছুদিন আগে তার স্বামী তাকে তাড়িয়ে দিয়েছে। সহায় সম্বলহীন
কুলসুম কাঁদতে কাঁদতে হাজির হয় তথ্য কেন্দ্রে। সেখান থেকে এই মহিলাকে
আইনি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেয়া হয়। কুলসুম এখন রীতিমত আইনি যুদ্ধে
নেমেছে স্বামীর বিরম্নদ্ধে।
বাবরীঝাড় থেকে একটু দুরের
গ্রাম ব্যাংমারী। সেখানকার কৃষক জবেদ আলী দীর্ঘদিন ধরে আঙ্গুলের ঘায়ে
কষ্ট পাচ্ছিলেন। তার কাছ থেকে জানা যাক পলস্নী তথ্য কেন্দ্র সম্পর্কে,
‘টাকার অভাবে আমি ভাল ডাক্তার দেখাতে পারিনি। যাও ছোটখাট দু’একজন
গ্রাম্য ডাক্তার দেখিয়েছি। কিন্তু তাতে কোন ফলাফল হয়নি। এভাবে রোগে
ভুগতে ভুগতে একদিন তথ্য কেন্দ্রে গিয়ে হাজির হই। সেখানকার একজন
পরামর্শ দেয় হেল্পলাইনে ফোন করতে। মোবাইলে ফোন করি ২৫ টাকা খরচ করে।
হেল্পলাইনের ডাক্তার আমাকে কিছু ঔষধের নাম বলে দেয়। সেগুলো খেয়ে আমি
এখন সুস্থ।
তথ্য কেন্দ্র থেকে উপকার
পাওয়া এরকম লোকের সংখ্যা অনেক। গত বছরের নভেম্বর মাসে স্থাপিত এই
তথ্য কেন্দ্র এখন পর্যন্ত বিভিন্ন ধরনের সেবা গ্রহন করেছে প্রায় আড়াই
হাজার গ্রাম্য মানুষ। এদের মধ্যে কেউ কেউ সেখান থেকে বিশ্ববিদ্যালয়ে
ভর্তি তথ্য নিয়েছে কেউবা নিয়েছে কৃষিভিত্তিক তথ্য আবার কেউবা খুজেঁছে
রোগ বালাই থেকে মুক্তির উপায়।
খরচাপাতি
ডি.নেট এর সিনিয়র রিসার্চ
এসোসিয়েটস ফরহাদ উদ্দিন জানান, এখান থেকে অনেকেই টাকার বিনিময়ে তথ্য
সেবা নিচ্ছে। বাবরীঝাড় তথ্য কেন্দ্র থেকে এখন পর্যন্ত আয় প্রায় ১০
হাজার টাকা। তবে গ্রামের একবারে দরিদ্র লোকদের জন্য সকল সেবা ফ্রি।
তিনি বলেন, ‘রিসার্চ ইনেশিয়েটিভ বাংলাদেশ’এর অর্থায়নে এই
টেলিসেন্টারটি চলছে। এখানে গ্রামীণ ফোন জিপিআরএস ব্যবহার করে
ইন্টারনেট ব্যবহারের সুযোগ আছে। গ্রাহকরা প্রতি ১০ মিনিট ৮ টাকা ও ৩০
মিনিট ১৫ টাকা হারে ইন্টারনেট ব্যবহার করতে পারে। শিৰার্থীদের ৰেত্রে
এই চার্জ কিছু কম। এছাড়া বিভিন্ন ধরনের তথ্য খোঁজা, প্রিন্ট সুবিধা,
ছবি তোলা, ওজন মাপা ইত্যাদির জন্যও রয়েছে বিভিন্ন ধরনের সার্ভিস
চার্জ। পলস্নী তথ্য কেন্দ্রে বিভিন্ন রেটের সার্ভিস চার্জ অনেকেই বেশি
মনে করছে। কারণ নিভৃত পলস্নীর মানুষগুলোর আয় রোজগার খুব একটা বেশি নয়।
এই প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে ইউএনডিপি’র প্রোগ্রাম ম্যানেজার (আইসিটিফোরডি)
কে. এ. এম. মোরশেদ জানান, এখানে রেটের চেয়ে গুরম্নত্বটাকেই বড় করে
দেখতে হবে। ই-গভর্নেন্স চালু হলে এসব তথ্যকেন্দ্র থেকে জমির পরচা/খতিয়ান
জানা যাবে। গ্রামের একজন মানুষের বছরে অন্তত দুইবার পরচা/খতিয়ান
সম্পর্কে জানতে হয়। আর এজন্য বিভিন্ন স্থানে দৌড়াদৌড়ি করে, ঘুষ দিয়ে
তারা কাজ সম্পন্ন করে। সবমিলিয়ে দেখা যায় একবার পরচা/খতিয়ান বের
করতেই পাঁচ থেকে ছয়’শ টাকা খরচ হয়ে যায়। কিন্তু ই-গভর্নেন্স চালু হলে
পলস্নী তথ্য কেন্দ্রে চলিস্নশ থেকে পঞ্চাশ টাকা খরচ করেই এসব তথ্য
পাওয়া যাবে। গ্রামের মানুষেরা এই বিষয়গুলো বুঝতে পারলে খরচাপাতি কোন
সমস্যা হিসেবে দাঁড়াবে না।
তথ্য কেন্দ্রের ভবিষ্যত
বাবরীঝাড় পলস্নী তথ্য
কেন্দ্রের প্রজেক্ট মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে এই আগষ্টে। এখন এই তথ্য
কেন্দ্রের ভবিষ্যত নিয়ে দেখা দিয়েছে নানা প্রশ্ন। কারণ প্রজেক্টের
মেয়াদ শেষ হবার সাথে সাথে সেন্টারটি বন্ধ হয়ে গেলে গ্রামের মানুষ
তথ্য সুবিধা থেকে বঞ্চিত হবে। আর তাই গ্রামের সাধারণ মানুষ চায়
কেন্দ্রটি বেেঁচ থাক। এ প্রসঙ্গে ফরহাদ উদ্দিন জানান, আমরা গ্রামের
মানুষদের নিয়ে একটি উপদেষ্টা কমিটি গঠন করেছি। এই কমিটির সাথে আমরা
আলাপ করবো। তাদের মতামত আমরা নেবো। এরপরে কেন্দ্রের ভবিষ্যত নির্ধারণ
করা হবে।
কম্পিউটার স্বাৰরতা কেন্দ্র
পলস্নী তথ্য কেন্দ্রের
পাশাপাশি বাবরীঝাড় গ্রামে একটি কম্পিউটার স্বাৰরতা কেন্দ্রও আছে।
বাবরীঝাড় দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের একটি কৰে অবস্থিত এই কেন্দ্র থেকে
এখন পর্যন্ত প্রায় দেড়শো স্কুল শিৰার্থী কম্পিউটার শিৰা নিয়েছে।
নীলফামারী জেলা শহর থেকে প্রায় ১০ কিলোমিটার দুরের এই গ্রামটিতে এখনো
পাকা রাস্তাঘাট তৈরি হয়নি। সামান্য বৃষ্টিতে কর্দমাক্ত হয়ে যায় এর
রাস্তাঘাট। সেখানকার একটি স্কুলের দেড়শো শিৰার্থী কম্পিউটার চালাতে
জানে। তাদেরকে এই সুযোগটি করে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক খান
ফ্যামিলি ফাউন্ডেশান। কেন্দ্রটি পরিচালনা করছে ডি.নেট। এ প্রসঙ্গে
উক্ত বিদ্যালয়ের কম্পিউটার শিৰক জনাব আক্তারম্নজ্জামান জানান, গত বছর
জুলাই মাসে এই কম্পিউটার স্বাৰরতা কেন্দ্রটি চালু করা হয়। আমরা ব্যাচ
করে শিৰার্থীদের বিনামূল্যে কম্পিউটার শিৰা দেই। প্রতিটি ব্যাচ মোট
১৬ দিন দুই ঘন্টা করে কম্পিউটার শেখার সুযোগ পায়। তাদেরকে মাইক্রোসফট
ওয়ার্ড, এক্সেল ও পেইন্ট শেখানো হয়।
অপ্রতুল কম্পিউটার শিৰা
‘আমাদের খুব কম শেখানো হয়।
কম্পিউটার তো এত অল্প কাজ করার জন্য নয়। তাই ওয়ার্ড, এক্সেল ছাড়া আরো
কিছু প্রোগ্রাম শিখালে আরো উপকৃত হতাম’- জানাল রনজিত কুমার। দ্বিমুখী
উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণীর শিৰার্থী।
শিৰার্থীদের এত কম
কম্পিউটার শিৰা প্রদান প্রসঙ্গে কম্পিউটার শিৰক মতিউর রহমান জানান,
আমরা শিৰার্থীদের কম্পিউটার স্বাৰর করে তুলছি। তাছাড়া অনেক শিৰার্থীকে
কম্পিউটার শিৰা দিতে হয় বলে এই কোর্সের বাইরে কিছু শেখানো সম্ভব হয়
না।
ভবিষ্যতে কী হবে?
৪টি কম্পিউটার দিয়ে সাজানো
হয়েছে বাবরীঝাড় কম্পিউটার স্বাৰরতা কেন্দ্র। বিদেশি অর্থায়নে
পরিচালিত এই প্রকল্পটির মেয়াদ শেষ হতে আরো বছর খানেক বাকি। এরপর কি
হবে এই কেন্দ্রের? এটি বন্ধ হয়ে যাবে নাকি স্থানীয় প্রশাসন চালাবে। এ
প্রসঙ্গে জনাব কামরম্নজ্জামান জানান, প্রকল্পের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে
কি হবে তা আমরা এখনো জানিনা। তবে কম্পিউটারগুলো স্কুল কর্তৃপৰের
কাছেই থাকবে। সেৰেত্রে হয়তো স্থানীয় প্রশাসন এই কেন্দ্রের দায়িত্ব
নিতে পারে।
পল্লী তথ্য কেন্দ্র ও
কম্পিউটার সাৰরতা কেন্দ্রগুলোকে জনপ্রিয় করে তুলতে ও মানুষের কাছাকাছি
নিয়ে আসার জন্য সকলের সহায়তা চায় ডি.নেট। পলস্নী তথ্য কেন্দ্র
প্রসঙ্গে ডি.নেট এর নির্বাহী পরিচালক অনন্য রায়হান জানান, অর্থের
বিনিময়ে তথ্য গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা বুঝতে হয়তো গ্রামীন জনগোষ্ঠীর আরো
কিছুটা সময় লাগবে। বাংলাদেশের পলস্নীতে তথ্য সেবা পৌঁছুক- এই দাবি
সকল শ্রেণীর মানুষের।
আর তাই বাবরীঝাড় গ্রাম এখন
একটি দৃষ্টান্ত হয়ে দেখা দিয়েছে অন্যান্যদের কাছে। সুশীল সমাজও
প্রত্যাশা করছে ভারতের মতো একসময় বাংলাদেশের সকল গ্রামেও স্থাপিত হবে
পলস্নী তথ্য কেন্দ্র। যা পলস্নীর মানুষগুলোর জীবনমান উন্নয়নে সহায়ক
হবে।
‘ অনেকে মনে করতো আমরা তথ্য
প্রযুক্তি’র মাধ্যমে দারিদ্রকে বিক্রি করছি ’ - অনন্য রায়হান,
নির্বাহী পরিচালক, ডি.নেট
তথ্য প্রযুক্তি সাধারন
মানুষের কাজে লাগবে কিনা তা গবেষণা করে দেখার উদ্দেশ্যে আমরা
টেলিসেন্টার বা তথ্য কেন্দ্র তৈরি করি। আমাদের টার্গেট ছিলো যদি কাজে
লাগে তাহলে সেটা নিয়ে এগুতে হবে। আমরা গবেষণা করে দেখেছি খুব
সচেতনভাবে এগুলে তথ্য কেন্দ্রগুলো থেকে ইতিবাচক সুবিধা পাওয়া সম্ভব।
আমাদের এই অভিজ্ঞতাকে শেয়ার করার উদ্দেশ্যেই রংপুরে ট্রেনিং
ওয়ার্কশপের আয়োজন করি। যাতে করে আরো অনেকে টেলিসেন্টার তৈরিতে আগ্রহী
হয়।
দেশের অনেক অঞ্চলে এখনো
বিদ্যুৎ পৌছাঁয়নি। ফলে পামটপ ব্যবহার করে দুর্গম অঞ্চলে টেলিসেন্টার
তৈরি করা যেতে পারে। কারণ পামটপ চার্জ দিয়ে অনেক সময় ব্যবহার করা যায়।
আবার মোবাইলের সিম লাগিয়ে ইন্টারনেটও ব্যবহার করা যায়। আমরা চেষ্টা
করছি পামটপের জন্য বাংলা ব্রাউজার তৈরি করতে। স্থানীয় জনগনের উপযোগী
কনটেন্ট তৈরি করার জন্য আমাদের সহায়তা প্রয়োজন। কারণ আমরা নিজেদের
খরচে এগুলো তৈরি করলে অনেক টাকা লাগবে। সরকারি-বেসরকারি সংগঠন সহায়তা
করলে এই খরচ কমিয়ে আনা যাবে। পাশাপাশি ট্রেনিং প্রোগ্রামগুলো
পরিচালনার জন্যও সহায়তা প্রয়োজন। অনেকে মনে করতো আমরা তথ্য
প্রযুক্তি’র মাধ্যমে দারিদ্রকে বিক্রি করছি। একসময় এধরনের কথাবার্তা
আমাদের মধ্যে সংকোচ বা দ্বিধা তৈরি করতো। ফলে আমরা সিদ্ধান্ত নিলাম
নিজেরাই করে দেখাবো। তো তথ্য কেন্দ্র করতে গিয়েও অনেক বাধার মধ্যে
পড়েছি। স্থানীয় জনগণ বলতো তথ্য দিয়ে কী হবে? তো তাদেরকে বোঝাতেও অনেক
সময় ব্যয় করেছি। আমরা প্রয়োজনীয় লোকবলের সংকটেও ভুগেছি। দৰ তথ্য কর্মী
তৈরির জন্য আমাদের বেগ পেতে হয়েছে।
মো. আরাফাতুল ইসলাম